ঢাকাSaturday , 29 August 2026

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরে এত আগ্রহ কেন ভারতের

banglarbibek
August 29, 2026 9:39 am । ৬ জন
Link Copied!
একাত্তর পোস্ট অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দিল্লিতে আগ্রহ বাড়ছে। এখনো সফরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এমনকি চলতি মাসের শুরুতে তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতির তথ্য ভুল করে প্রকাশ পাওয়ার পর তা দ্রুত প্রত্যাহারও করা হয়।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এ এম সালেহ শিবলী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানিয়েছেন, ভারত সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ভারতের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ এবং উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হবে তার প্রথম দিল্লি সফর। ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিপুল জয় নিয়ে সরকার গঠনের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে।

কেন এত আগ্রহ ভারতের

শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বর্তমানে দিল্লির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অস্বস্তির জায়গা শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। বাংলাদেশ তাকে প্রত্যর্পণের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। বাংলাদেশের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডও দিয়েছে। তবে হাসিনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ভারত জানিয়েছে, ঢাকার অনুরোধ তারা বিবেচনা করছে।

হাসিনার ভারতে অবস্থানের মধ্যেই তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে দিল্লি। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন।

ভারতের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে সর্বোচ্চ সম্মান ও স্মরণীয় অভ্যর্থনা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশের কোনো নেতার সফর নিয়ে দিল্লির এমন প্রকাশ্য আগ্রহকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা।

বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও বাণিজ্যেও ভারতের স্বার্থ

বাংলাদেশ ভারতের জন্য শুধু প্রতিবেশী দেশ নয়, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সীমান্ত প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ। রয়েছে ভাষা ও সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠতাও।

দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। গত বছর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল, যার বড় অংশ ভারতের অনুকূলে। পাশাপাশি বাংলাদেশের মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ঢাকার গুরুত্ব রয়েছে।

হাসিনা সরকারের সময় সড়ক, রেল ও বন্দর যোগাযোগ সম্প্রসারণে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করেছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ছিল। ফলে নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হলে এসব কৌশলগত সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে দিল্লির।

পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতাও নজরে

হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

এই পরিবর্তন ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অতীতে বাংলাদেশে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের কার্যক্রম এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ নিয়ে দিল্লি উদ্বেগ জানিয়েছিল। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছিল।

ফলে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কের নতুন ঘনিষ্ঠতা ভারতের কৌশলগত হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে এবং নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ বাড়াতে চাইছে দিল্লি-এমন বিশ্লেষণই সামনে আসছে।

মক্কা চুক্তিও ভারতের ভাবনায়

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণ। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান চলতি মাসে ‘মক্কা চুক্তি’ নামে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির বিস্তারিত কাঠামো এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও এটি সম্মিলিত প্রতিরক্ষার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে তাতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ বিবেচনা করতে পারে। ফলে ঢাকার সম্ভাব্য অবস্থানও ভারতের কৌশলগত পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে।

কূটনীতিকদের মতে, বাংলাদেশ যদি একই সময়ে ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে থাকে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় ঢাকার কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়বে। ভারত তাই নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি দ্রুত শক্ত করতে চাইছে।

তারেক রহমানের সামনে ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের জন্যও ভারত সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত। একদিকে ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ; অন্যদিকে দেশে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে জনমনে ক্ষোভ রয়েছে।

ভারতে থাকা অবস্থায় হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যও বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ফলে এমন সময়ে দিল্লি সফর করলে তারেক রহমানকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে।

তবে কূটনৈতিকভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এবং ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনকে ঘিরে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগের আরও সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন যোগাযোগ, বাণিজ্য ও জ্বালানি স্বার্থ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ-এই কয়েকটি বিষয় তারেক রহমানের দিল্লি সফরকে ভারতের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

এখন দেখার বিষয়, দিল্লির ধারাবাহিক আমন্ত্রণ ও কূটনৈতিক তৎপরতার পর শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে সম্মতি দেন কি না।