
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীতে আমন আবাদের ভরা মৌসুমেও সারের বাজারে নৈরাজ্য থামছে না। সরকারি বরাদ্দ ও সরবরাহ থাকার পরও কৃষককে সরকার নির্ধারিত দামে সার কিনতে হচ্ছে না। কোথাও ডিলারের দোকানে সার নেই, আবার খুচরা দোকানে চড়া দামে মিলছে চাহিদামতো সার। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার, অবৈধ খুচরা বিক্রেতা ও তদারকির দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন লাখো কৃষক।
কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই সার বিক্রিতে অনিয়ম চলছে। আগে ডিলাররা বরাদ্দ পাওয়ার আগেই বরাদ্দপত্র কালোবাজারিদের কাছে বিক্রি করতেন। এখন গুদাম থেকে সার তুলে দোকানে নেওয়ার আগেই খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। আবার এক জেলার সার অন্য জেলায় কিংবা এক উপজেলার সার অন্য উপজেলায় পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ফলে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০ কেজির এক বস্তা সারে স্থানভেদে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে কৃষককে। অথচ জেলা ও উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির নিয়মিত সভায় সারের সংকট নেই এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়া হচ্ছে না বলে দেখানো হচ্ছে।
মাঠের চিত্র ভিন্ন
রাজশাহীর মোহনপুর, তানোর ও গোদাগাড়ীর বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাঠে এখন আমন আবাদের ব্যস্ততা। কোথাও জমি তৈরির কাজ চলছে, কোথাও আগাম জাতের আমন ধানের চারা রোপণ করছেন কৃষক। আগস্টের শেষ পর্যন্ত চলবে এই কর্মযজ্ঞ।
ভালো ফলনের আশায় কৃষকরা বিভিন্ন ধরনের সার সংগ্রহে ছুটছেন এক দোকান থেকে আরেক দোকানে। সামর্থ্যবান কৃষক বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে পারলেও বিপাকে পড়েছেন মাঝারি ও প্রান্তিক কৃষক। প্রয়োজনীয় এক-দুই বস্তা সার কিনতেও তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তানোরের রিশিকুল ইউনিয়নের ছোট পলাশী গ্রামের কৃষক সাজেদুর রহমান বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত দামে কোথাও সার পাচ্ছেন না। ডিলারের দোকানে গেলে বলা হচ্ছে সার নেই। বাধ্য হয়ে বেশি দামের খুচরা দোকান থেকে সার কিনতে হচ্ছে।’
সরকার নির্ধারিত দাম মানা হচ্ছে না
রাজশাহী জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি সূত্রে জানা যায়, কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সার দিতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে ডিলারদের মাধ্যমে সার সরবরাহ করছে। কৃষক পর্যায়ে ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপির দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিন্তু তানোরের পলাশী গ্রামের কৃষকদের অভিযোগ, টিএসপির এক বস্তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। কোথাও আরও বেশি নেওয়া হচ্ছে। ডিএপি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকায়। আর ১ হাজার ৫০ টাকা দামের এমওপির বস্তাতেও নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত প্রায় ৫০০ টাকা।
পবা উপজেলার বড়াইকুড়ি গ্রামের কৃষক রাসেল হোসেন বলেন, ‘ডিলারের কাছে গেলে মজুত শেষ বলে জানানো হয়। অথচ খুচরা বিক্রেতাদের কাছে গেলে যত সার লাগে দিতে চায়। তবে দাম বেশি।’
বরাদ্দ আছে, তবু সংকট কেন?
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকাশিত বরাদ্দ তালিকা অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্ট মাসে রাজশাহী অঞ্চলের জেলাগুলোতে নন-ইউরিয়া সারের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। কৃষকদের প্রশ্ন, বরাদ্দ বাড়ানোর পরও বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না কেন?
বিএডিসির ডিলার মেসার্স হক অ্যান্ড সন্সের মালিক আব্দুল হক বলেন, ‘২০২ বস্তা সার তিন দিনের মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে।’
অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, ‘সার সংকটের কোনো খবর আমাদের জানা নেই।’
বিএডিসির সহকারী পরিচালক (সার) নাসির উদ্দিনের দাবি, কৃষকরা জমিতে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করায় চাহিদা বেশি থাকছে এবং দ্রুত মজুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
তদারকি নিয়েও প্রশ্ন
কৃষকদের অভিযোগ, সার বিতরণ ও বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় কার্যকর তদারকি নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক দাবি করেন, মাঠ পর্যায়ের কিছু কৃষি কর্মকর্তা ও অসাধু ডিলারের যোগসাজশে সার নিয়ে অনিয়ম চলছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার অবৈধ খুচরা সার বিক্রেতারাও জড়িত।
তবে অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলেও দাবি কৃষকদের। তাদের প্রশ্ন, সরকারি বরাদ্দ থাকার পরও যদি ডিলারের দোকানে সার না মেলে, অথচ অবৈধ খুচরা দোকানে বেশি দামে সার পাওয়া যায়, তাহলে এর পেছনে কারা রয়েছে—তা খুঁজে বের করা হচ্ছে না কেন?
রাজশাহী জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষক তথ্য দিলে বিষয়টি তদন্ত করা হবে।’
কৃষকদের অভিযোগ, প্রশাসনের এমন আশ্বাস নিয়মিত মিললেও মাঠে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে আমন মৌসুমে সারের বাড়তি দামের বোঝা বহন করতে হচ্ছে কৃষকদেরই। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে সরকার নির্ধারিত দামে সার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সার পাচার ঠেকাতে অভিযান
কৃষকের জন্য সরকারি বরাদ্দের সার নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান বাজারে অভিযান চালিয়ে ১২ বস্তা রাসায়নিক সার জব্দ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ঘটনায় মেসার্স সাইদুর ট্রেডার্সের মালিক ও সার ডিলার সাইদুর রহমানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।বিনোদন খবর
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হরিয়ান বাজারে ওই প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইবনুল আবেদীন। সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬-এর ১২ ধারায় সাইদুর রহমানকে এ অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বেশ কিছুদিন ধরে সরকারি সার কিনতে গিয়ে তাঁরা নানা সমস্যার মুখে পড়ছিলেন। প্রয়োজনের সময় ডিলারের কাছে সার না পেয়ে অনেক কৃষককে অন্য স্থান থেকে বেশি দামে সার কিনতে হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারায় ফসলের উৎপাদন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে সরকারি বরাদ্দের সার অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে স্থানীয় কৃষকেরা টিএসপি ও অন্যান্য রাসায়নিক সারসহ ১২ বস্তা সার আটক করে প্রশাসনকে খবর দেন।
খবর পেয়ে ইউএনও মো. ইবনুল আবেদীন ঘটনাস্থলে গিয়ে সারগুলোর মজুত, সংরক্ষণ ও সরবরাহের বিষয়ে খোঁজ নেন। অভিযানে সরকারি বরাদ্দের সার নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। পরে ডিলার সাইদুর রহমানকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
ইউএনও মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, কৃষকের জন্য বরাদ্দ সরকারি সার কোনোভাবেই অবৈধভাবে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া বা নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে বিক্রি করা যাবে না। সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে ডিলারদের মজুত, সরবরাহ ও বিক্রয় কার্যক্রম নিয়মিত নজরদারির আওতায় রাখা হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি সার পাচার, কালোবাজারি কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো চেষ্টা প্রশাসন মেনে নেবে না। কৃষকের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সরকারি সার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ঠেকাতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।





